Visual Artist
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার ঐতিহাসিক শহর শান্তিপুর। এই শহরের গলিঘুঁজি বেয়ে চলতে থাকলে একজন মানুষের কথা জানা যায়, যাঁর জীবন একটি অসাধারণ লড়াইয়ের আখ্যান। পেশায় তিনি গণিতের শিক্ষক, কিন্তু পরিচয়ে তিনি আজ একজন পূর্ণমাত্রার চিত্রশিল্পী। তাঁর নাম রাজু প্রামাণিক। শুধু শিল্পীর পরিচয়টুকু নয়, তাঁর জীবনের প্রতিটি তুলির আঁচড়ের পেছনে রয়েছে একটি শরীর যে প্রতিদিন যন্ত্রণার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে, এবং একটি মন যে সেই যন্ত্রণাকে রঙে, রেখায়, আলোছায়ায় রূপান্তরিত করে চলেছে অবিরাম।
রাজু প্রামাণিক একজন সরকারি স্কুলের গণিত শিক্ষক। সংখ্যার জগতে তাঁর অনায়াস বিচরণ। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই তাঁর ভেতরে একটি অন্য সত্তা বাস করত — সেই সত্তা রেখা আঁকতে চাইত, রঙ মাখাতে চাইত ক্যানভাসে। প্রথাগত শিল্পশিক্ষার কোনো সুযোগ হয়নি তাঁর, তবু ছবির প্রতি একটা অন্তরের টান সবসময় ছিল, নিভু নিভু প্রদীপের মতো, যা কখনো সম্পূর্ণ নেভেনি।
কিন্তু জীবন এগোয় তার নিজের ছন্দে। শিক্ষকতা, সংসার, দৈনন্দিনতার চাপে সেই আঁকার ইচ্ছেটা চাপা পড়েই থাকত। এর মধ্যে এসে পড়ল এক ভয়াবহ বাস্তবতা। রাজু প্রামাণিক আক্রান্ত হলেন অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস (Ankylosing Spondylitis) নামে একটি দুরারোগ্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে।
সাধারণ মানুষের কাছে এই রোগের নামটি অপরিচিত হলেও যাঁরা এতে ভুগছেন, তাঁদের কাছে এটি প্রতিদিনের এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত বাতরোগ (inflammatory arthritis) যা মূলত মেরুদণ্ডকে আক্রমণ করে। রোগটির প্রধান লক্ষণ হলো পিঠে ও কোমরে তীব্র ব্যথা এবং শরীরের নমনীয়তা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া। উন্নত পর্যায়ে মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলি একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যায়, যার ফলে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে ঝুঁকে পড়া, ঘাড় ঘোরানো, এমনকি সোজা হয়ে বসে থাকাও কষ্টের হয়ে যায়।
রাজু প্রামাণিকের ক্ষেত্রেও তাই-ই হয়েছে। একজন স্বাভাবিক মানুষ যত সহজে শরীর নাড়াতে পারেন, সেটুকু করতেও তাঁকে অনেক বেশি পরিশ্রম ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। কিন্তু এই শরীরই তাঁকে শিল্পীর পথে নিয়ে এল।
২০১৮ সাল। রাজু প্রামাণিকের জীবনে এল এক বড় সংকট। রোগের জটিলতায় তাঁকে একটি বড় অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হলো। সেই অপারেশনের পর প্রায় তিন মাস বাড়িতে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হলো তাঁকে। বাইরে যাওয়া নেই, স্কুল নেই, পরিচিত কর্মব্যস্ততা নেই। চার দেওয়ালের মধ্যে শুধু সময় আর শরীরের ব্যথা।
তখনই, সেই একাকীত্বের মুহূর্তে, কাগজ আর পেন্সিল হাতে তুলে নিলেন রাজু। সময় কাটানোর জন্য শুরু হয়েছিল যাত্রা, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা হয়ে উঠল প্রাণের আশ্রয়। একটার পর একটা স্কেচ হতে লাগল। পেন্সিলের রেখায় ফুটে উঠতে লাগল দৃশ্য, মানুষ, প্রকৃতি। শরীর যতটুকু অনুমতি দেয়, তার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেলেন এক অসীম মুক্তির আকাশ।
এরপর এল ২০২০। সারা পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল করোনা মহামারীতে। লকডাউনে ঘরবন্দি হলো দেশ। যে বিপদকে বাকি পৃথিবী সহ্য করছিল কষ্টে, রাজু প্রামাণিক সেই দীর্ঘ একাকীত্বকে পরিণত করলেন সুযোগে। বাড়িতে বসে আঁকলেন, ফের আঁকলেন। ছবি আঁকা তাঁর কাছে আর শুধু শখ রইল না — হয়ে উঠল একটি ধ্যান, একটি সাধনা।
ওয়াটার কালার দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। এরপর একে একে যুক্ত হলো অ্যাক্রিলিক, তারপর অয়েল পেইন্টিং। আজ তাঁর সবচেয়ে পছন্দের মাধ্যম ওয়াটার কালার ও অ্যাক্রিলিক। তাঁর ক্যানভাসে জায়গা পায় অ্যাটমোস্ফেরিক ল্যান্ডস্কেপ, সিটিস্কেপ, পুরনো স্থাপত্য, মন্দিরের নিস্তব্ধতা এবং পৌরাণিক আখ্যানের দৃশ্যপট। প্রতিটি ছবিতে যেন একটি অনুভূতির গল্প বলার চেষ্টা।
আঁকা ছবিগুলো একসময় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করতে শুরু করলেন রাজু প্রামাণিক। সাড়া এলো অপ্রত্যাশিতভাবে। দেশ-বিদেশের মানুষ তাঁর কাজ দেখলেন, ভালোবাসলেন, উৎসাহ দিলেন। এই উৎসাহই তাঁকে নিয়ে গেল প্রদর্শনীর মঞ্চে। বিভিন্ন আর্ট এক্সিবিশনে তাঁর ছবি জায়গা পেল, এবং কিছু ছবি সংগ্রহ করলেন শিল্পপ্রেমীরা।
তবে সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তটি এলো যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক সভায় রাজু প্রামাণিক লাইভ পেইন্টিং করার সুযোগ পেলেন। সেই আসরে আঁকা ছবিটি সংগ্রহ করলেন সাংসদ মাননীয়া মহুয়া মৈত্র। একজন স্ব-শিক্ষিত শিল্পীর জন্য, যাঁর শরীর প্রতিদিন বাধা দেয়, এ ছিল এক অবিশ্বাস্য অর্জন।
নিজের শিল্পচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাজু প্রামাণিক ভাবলেন শহরের অন্য শিল্পীদের নিয়ে একসাথে কিছু করার। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠল Santipur Painters — শান্তিপুরের শিল্পীদের একটি একনিষ্ঠ দল। এই গোষ্ঠী শুধু ছবি আঁকে না, একসাথে প্রদর্শনীর আয়োজন করে, ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে, আউটডোর পেইন্টিং সেশনে বেরিয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক কাজেও অংশ নেয়। এই গোষ্ঠী শান্তিপুরের শিল্পজগতে এক নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।
রাজু প্রামাণিক নিজেই স্বীকার করেন — ছবি আঁকা তাঁর কাছে শুধু সৃষ্টির আনন্দ নয়, এটি তাঁর চিকিৎসাও বটে। অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসের যন্ত্রণা যেদিন বেশি থাকে, সেদিনও তুলি হাতে বসলে মন ভালো হয়। শিল্পচর্চার মধ্যে দিয়ে তিনি শারীরিক ও মানসিক দুদিক থেকেই আগের তুলনায় অনেক ভালো আছেন। বিজ্ঞানও বলে — সৃজনশীল কাজ দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার অনুভূতিকে কিছুটা লাঘব করে, এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে।
চল্লিশ বছর বয়সের পর শুরু হওয়া এক শিল্পীর যাত্রা আজ বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। যাঁর শরীর সীমা টানে, তিনি সেই সীমাকে অতিক্রম করেন রঙ ও তুলির ভাষায়। রাজু প্রামাণিকের প্রতিটি ছবিই শুধু দৃশ্য নয় — তা একটি মানুষের লড়াইয়ের দলিল, যে লড়াইয়ের শেষে নেই পরাজয়, আছে কেবল সৃষ্টি।